নিজস্ব প্রতিবেদঃপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ করার পরও মোঃ শরিফুল ইসলামের সামনে কর্মজীবনের পথটি স্পষ্ট ছিল না। ছয় সদস্যের পরিবারের দায়িত্ব, নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং স্থায়ী আয়ের পথ খুঁজে না পাওয়ার চাপ—সব মিলিয়ে তিনি এমন একটি সুযোগ খুঁজছিলেন, যা তাঁকে বাস্তব দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি কর্মজীবনে প্রবেশের একটি কার্যকর পথ দেখাতে পারে।
একদিন শেরপুর সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজে অ্যাসেট প্রকল্পের শর্ট কোর্সের ভর্তি বিজ্ঞপ্তি তাঁর নজরে আসে। সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তিনি আইটি সাপোর্ট সার্ভিস লেভেল-৩ কোর্সে নির্বাচিত হন।
প্রশিক্ষণে কম্পিউটার ও আইটি সাপোর্ট-সংক্রান্ত বিভিন্ন কাজ হাতে-কলমে শেখার সুযোগ পান শরিফুল। নিয়মিত ব্যবহারিক অনুশীলনের মাধ্যমে প্রযুক্তিগত জ্ঞানকে বাস্তব দক্ষতায় রূপ দেওয়ার পাশাপাশি নিজের সক্ষমতার ওপর তাঁর আত্মবিশ্বাসও বাড়তে থাকে। প্রশিক্ষণ শেষে এনএসডিএ-এর সিবিটি অ্যাসেসমেন্টে তিনি কম্পিটেন্ট হন।
কিন্তু শরিফুলের পথচলা শুধু প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করা বা কম্পিটেন্ট হওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। অর্জিত দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি এবার উদ্যোক্তা হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
৬টি কম্পিউটার দিয়ে শুরু নতুন পথচলা
একজন অংশীদার হিসেবে শরিফুল “রিয়েল কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টার” প্রতিষ্ঠা করেন। শুরুতে প্রতিষ্ঠানটিতে ছিল মাত্র ৬টি কম্পিউটার। সীমিত পরিসরে শুরু হলেও ধীরে ধীরে প্রশিক্ষণার্থীদের সাড়া বাড়তে থাকে।
মাত্র ছয় মাসের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির কম্পিউটারের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১৫টিতে। ব্যবসার পরিধি বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে তিনজন মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হয়।যে তরুণ একসময় নিজের কর্মসংস্থানের পথ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ছিলেন, তিনি এখন নিজের দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে এমন একটি উদ্যোগের অংশীদার হয়েছেন, যেখানে অন্য মানুষের জন্যও কাজের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
শেখার পথ থামাননি শরিফুল
উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি শরিফুল নিজের দক্ষতা উন্নয়নের ধারাও অব্যাহত রাখেন। পরবর্তীতে তিনি গ্রাফিক ডিজাইন লেভেল-৩ কোর্স সম্পন্ন করেন। নতুন দক্ষতা অর্জন, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান পরিচালনার অভিজ্ঞতা এবং বাস্তব কর্মপরিবেশের সঙ্গে সম্পৃক্ততা তাঁর পেশাগত সক্ষমতাকে আরও সমৃদ্ধ করে।
এই অভিজ্ঞতাই পরবর্তীতে তাঁর সামনে নতুন একটি সুযোগ নিয়ে আসে।
প্রায় এক বছর তিন মাস পর শেরপুর সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজে আইটি সাপোর্ট সার্ভিসের গেস্ট ট্রেইনার পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হলে শরিফুল আবেদন করেন। দক্ষতা ও যোগ্যতা যাচাইয়ের পর তিনি গেস্ট ট্রেইনার হিসেবে নির্বাচিত হন।
একসময় যে প্রতিষ্ঠানে তিনি নিজে প্রশিক্ষণার্থী হিসেবে দক্ষতা অর্জন করেছিলেন, এখন সেই কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থারই একজন প্রশিক্ষক হিসেবে নতুন প্রশিক্ষণার্থীদের দক্ষ করে তুলতে ভূমিকা রাখছেন।
প্রশিক্ষণার্থী থেকে উদ্যোক্তা, এরপর প্রশিক্ষক
আজ শরিফুল একই সঙ্গে একজন অংশীদার উদ্যোক্তা ও একজন গেস্ট ট্রেইনার। তাঁর চাকরি এবং আত্মকর্মসংস্থান দুই ক্ষেত্রেই ২৪ হাজার টাকার বেশি আয়ের তথ্য রয়েছে।
তবে তাঁর সাফল্যকে শুধু মাসিক আয়ের অঙ্ক দিয়ে বিচার করলে পুরো গল্পটি ধরা পড়ে না। শরিফুলের পথচলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তাঁর ধারাবাহিক অগ্রগতি
বেকারত্ব, দক্ষতা অর্জন → এনএসডিএ অ্যাসেসমেন্টে কম্পিটেন্ট, অংশীদার হিসেবে প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা, প্রতিষ্ঠানের সম্প্রসারণ ৩ জনের কর্মসংস্থান সৃষ্টি,গেস্ট ট্রেইনার।
নিজের কর্মসংস্থানের পথ খুঁজতে যে দক্ষতার যাত্রা শুরু করেছিলেন, আজ সেই দক্ষতা তাঁকে উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ দিয়েছে এবং অন্যদের দক্ষ করে তোলার দায়িত্বেও পৌঁছে দিয়েছে।
মোঃ শরিফুল ইসলামের গল্প তাই শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়,এটি কারিগরি ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা যখন উদ্যোগ, ধারাবাহিক শেখা এবং বাস্তব প্রয়োগের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন একজন প্রশিক্ষণার্থী নিজের কর্মজীবন গড়ার পাশাপাশি অন্য মানুষের জন্যও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারেন তারি জ্বলন্ত উদাহরণ মোঃ শরিফুল ইসলাম।

