চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে শিশু জুলিয়া আক্তারকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় এক মর্মান্তিক বিচারবিভাগীয় ভুল সামনে এসেছে। ওই মামলায় প্রকৃত আসামিকে গ্রেপ্তার না করে নির্দোষ আমির হোসেনকে অভিযুক্ত করেছিল পুলিশ। তবে বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার পর দীর্ঘ ২১ বছরের আইনি লড়াই শেষে অবশেষে তিনি খালাস পেয়েছেন।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) আমির হোসেনকে খালাস দিয়ে হাইকোর্টের দেওয়া পূর্ণাঙ্গ রায়ের অনুলিপি প্রকাশিত হয়। এর আগে গত ১ সেপ্টেম্বর ডেথ রেফারেন্স ও আসামির আপিলের শুনানি শেষে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ তাকে খালাস ঘোষণা করেন।
আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণ ও পারিপার্শ্বিক তথ্য পর্যালোচনা করে জানান, পুলিশ আসল অপরাধীকে না ধরে ভুল করে নির্দোষ আমিরকে গ্রেপ্তার করেছিল।
যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত ও ভুল তদন্ত
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০০৫ সালের ১৬ মে হাটহাজারী উপজেলার মেখে গ্রামে ফুফুর বাড়িতে বেড়াতে যায় ১০ বছরের শিশু জুলিয়া আক্তার। ওই বাড়িতে দিনমজুর হিসেবে কাজ করতেন আমির হোসেন।
সেদিন জুলিয়াকে অপহরণের পর নির্জন স্থানে নিয়ে ধর্ষণ ও শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। এরপর মরদেহ ফেলে দেওয়া হয় পার্শ্ববর্তী খালে। পরে পুলিশ সেখান থেকে মরদেহ উদ্ধার করে।
এই ঘটনার পর নিহত শিশুর পরিবারের পক্ষ থেকে আমির হোসেনকে একমাত্র আসামি করে মামলা দেওয়া হয়। কিন্তু তদন্তে চরম গাফিলতি সত্ত্বেও ২০০৮ সালের ২৫ আগস্ট পুলিশ আদালতে চূড়ান্ত অভিযোগপত্র জমা দেয়।
আসল অপরাধী কে ছিল?
মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়ে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। বাস্তবে শিশু জুলিয়াকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার মূল অপরাধী ছিলেন জামাল নামে আরেক ব্যক্তি, যিনিও ওই বাড়িতে দিনমজুরের কাজ করতেন। তবে পুলিশ তাকে বাদ দিয়ে আমির হোসেনকেই অভিযুক্ত করে।
পরবর্তী সময়ে ২০০৯ সালের ৮ সেপ্টেম্বর ১৯ জন সাক্ষীর গ্রহণের মধ্য দিয়ে মূল বিচারকাজ শুরু হয়। দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে ২০১৯ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ আমির হোসেনকে দোষী সাব্যস্ত করে রায় দেন।
তৎকালীন রায়ে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের পাশাপাশি মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
হাইকোর্টের রায় ও দীর্ঘ কষ্টের অবসান
বিচারিক আদালতের সেই মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করেন আমির হোসেন। একই সাথে শুরু হয় ডেথ রেফারেন্সের শুনানি।
অবশেষে হাইকোর্ট সব তথ্য-প্রমাণ পুনরায় পর্যালোচনা করে দেখতে পান যে তদন্তে মারাত্মক ভুল ছিল। ফলে গত ১ সেপ্টেম্বর তাকে সম্পূর্ণ নির্দোষ ঘোষণা করে খালাস দেওয়া হয়।
এর মাধ্যমে দীর্ঘ ২১ বছরের আইনি প্রক্রিয়া, মৃত্যুদণ্ডের জাঁতাকল এবং বছরের পর বছর কারাভোগের পর আমির হোসেন সব অভিযোগ থেকে মুক্তি পেলেন।

